spot_img
Homeপ্রধান প্রতিবেদননারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব পরিচালনা করে পরিবারের পুরুষ সদস্য

নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব পরিচালনা করে পরিবারের পুরুষ সদস্য

দেশের শেয়ারবাজারে নারী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহন খুবই হতাশাজনক। তিনজন পুরুষের বিপরীতে মাত্র একজন নারীর বিও হিসাব রয়েছে শেয়ারবাজারে। তবে এই অনুপাতটি দিয়ে আসল চিত্র তুলে ধরা যায় না। কারণ, যেসব নারীর বিও হিসাব রয়েছে, তারমধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ সক্রিয় হিসাব। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো: ৪৫ শতাংশ নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব পরিচালনা করেন তার পরিবারের পুরুষ সদস্য। এরঅর্থ এই নারী বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেন না। উল্লেখ্য, শেয়ারবাজারে এই বিও হিসেবের মাধ্যমেই একজন বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনাবেচা করে থাকেন।

শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণে তারা কতটা আগ্রহী? এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ও বিনিয়োগ শিক্ষায় কাজ করছে সরকারের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম)। এই ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং নারী বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কমিটির আহবায়ক কাশফিয়া শারমিন এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গবেষনায় সহায়তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারেক। এই গবেষণায় এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে যা আবারও প্রমাণ করে যে, এ খাতে নারীরা কতটা পিছিয়ে আছে। গবেষনার একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো: এ বিষয়ে আগের গবেষণাগুলোতে নারীদের পিছিয়ে থাকার পেছনে টাকার অভাব, সংসারের চাপ, লিঙ্গবৈষম্যের মতো বিষয়গুলো দেখা গেছে। কিন্তু নতুন এই গবেষনায় একটা জরুরি বিষয় উঠে এসেছে, তাহলো ‘লিঙ্গভিত্তিক ডিজিটাল বিভাজন’। এর মানে হলো, নারীদের অনেকের কাছেই প্রযুক্তি আর অনলাইন সুবিধার অভাব রয়েছে, যেটা আজকের ডিজিটাল যুগে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য খুবই দরকারি। এছাড়া শেয়ার বাজার সম্পর্কে নারীদের জ্ঞানের অভাব, বিনিয়োগ করার প্রক্রিয়ার জটিলতার মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই সমস্যার সমাধানে নারীদের জন্য আলাদা করে আর্থিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এই ধরনের শিক্ষামূলক কার্যক্রম নারীদের আর্থিক ধারণাগুলো বুঝতে সাহায্য করবে এবং শেয়ার বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াবে। গবেষনায় সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ৪ লক্ষ ৩২ হাজার ৬২ জন নারী এবং ১৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ৯৫২ জন পুরুষ সক্রিয় বেনিফিশিয়ারি ওনার্স’ (বিও) অ্যাকাউন্টধারী আছেন। এ হিসেবে তিনজন পুরুষের বিপরীতে একজন নারীর বিও অ্যাকাউন্ট আছে। যদিও ১:৩ অনুপাতটি আশাব্যাঞ্জক কিন্তু আসল চিত্রটি হচ্ছে, শীর্ষ ১০ শতাংশ নারী অ্যাকাউন্টধারীর পুঁজিবাজারে সক্রিয় যার সংখ্যা মাত্র ৪৩ হাজার ২০৬ জন। তথ্য বলছে, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিও হিসেবের ব্যালেন্স উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৪-এর এপ্রিলে পুরুষদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা, যেখানে নারীদের ছিল মাত্র ২৮ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা, যা পুরুষদের তুলনায় মাত্র ১৬ শতাংশ। এই গবেষণায় উঠে এসেছে, নারী বিনিয়োগকারীদের সিংহভাগই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। যা প্রায় ৬৭ শতাংশ। এরপরই চট্টগ্রামের অবস্থান, প্রায় ২১ শতাংশ । দেশের বাকি অঞ্চলগুলোতে নারী বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি খুবই কম, মাত্র ১২ শতাংশের আশেপাশে। আরেকটি বড় তথ্য হলো, নারী বিও হিসেবের মধ্যে শীর্ষ ১০ শতাংশ নারী বিনিয়োগকারী দখল করে আছেন মোট শেয়ার ব্যালেন্সের ৯৩.৩৩ শতাংশ ! বাকি ৯০ শতাংশ নারী হিসাবধারীর কাছে রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ শেয়ার ব্যালেন্স। এই বড় ফারাকটি দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের পুঁজিবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কতোটা অসম।

বিআইসিএম চলতি বছরের জানুয়ারীতে একটি জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপের ফলাফল বলছে, নারী বিও হিসেবধারীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ নিজেরাই হিসেব পরিচালনা করেন। কিন্তু বাকি ৪৫ শতাংশের বিও হিসেব তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করেন। অর্থাৎ, বিও হিসেব নারীদের নামে থাকলেও তা পরিচালনা করেন পুরুষ সদস্য। শেয়ার বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কম কেন? মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হল আর্থিক জ্ঞানের অভাব। এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই একটা বড় সমস্যা। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের পড়াশোনা কম, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এই গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আর্থিক জ্ঞান থাকাটা খুব জরুরি। এই জ্ঞানের অভাবে নারীরা বিনিয়োগের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস পান না, এবং শেয়ার বাজার থেকে দূরে থাকেন।

এছাড়া, ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে নারীদের কম যোগাযোগ ও বিনিয়োগ করার প্রক্রিয়ার জটিলতার জন্যও তারা শেয়ারবাজার থেকে দূরে থাকেন। এর ফলে শুধু নারীদের ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় তাই নয়, দেশের অর্থনীতি এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। এই গবেষনা প্রসঙ্গে বিআইসিএম’র সহকারী অধ্যাপক কাশফিয়া শারমিন বলেন, এই গবেষণার মধ্যে দিয়ে নারীরা আর্থিক খাতে বিশেষ করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা পিছিয়ে আছে, তা উঠে এসেছে। সেইসাথে নারীদের জন্য কি কি করা দরকার তাও বলা হয়েছে। তিনি বলেন, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং শেয়ার বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য আর্থিক জ্ঞান বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আর এখন তো ডিজিটাল যুগ! অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং টুল ব্যবহার করে নারীরা আরও সহজে বিনিয়োগ করতে পারছেন। কিন্তু এজন্য তাদের ডিজিটাল জ্ঞান বাড়াতে হবে।পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম এ প্রসঙ্গে বলেন, নারীরা একটু বেশী হিসেবী। তারা পুঁজিবাজারে রিস্ক নিতে চায় না। এছাড়া, এখন এফডিআর, বন্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করে বেশী রিটার্ণ পাওয়া যায়। এ কারণে হয়তো পুঁজিবাজারে নারীদের অংশগ্রহন কম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএএসএম ও বিআইসিএম কাজ করছে। কিন্তু এটা ঠিক বিনিয়োগকারীদের কাছে থেকে সেভাবে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নারীদের বিনিয়োগ শিক্ষার ব্যাপারে আলাদাভাবে ফোকাস করে কিছু করা যায় কিনা তা বিএসইসি দেখবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জনপ্রিয় সংবাদ

Recent Comments